‘ইসির মাথা মনন কিছুই নেই, মানুষ এমন লাজলেহাজহীন হয়!’

143

স্টাফ রিপোর্টার:
বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের সফলতা যেমন দুর্বলতাও কম নয়। আমরা অনেক কিছুকেই সময়মতো সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করি না এবং যার যেটুকু পাওনা অনেক সময় অনেককে বেশি দিই, আবার কখনোসখনো কাউকে কাউকে কিছুই দিতে চাই না। কিছু দিতে গেলেও কৃপণতা করি। কত কিছু হলো, আজ যদি ’৭১-৭২-এ যাদের ভূমিকার জন্য আমরা দাঁড়িয়ে আছি তাদের কথা বিচার করি বিশ্লেষণ করি প্রকৃত অর্থে আমরা তাদের অনেককে খুঁজেই পাব না। আমাদের মনে নেই। সাহিত্যিক-সাংবাদিক-লেখক কারও স্মৃতিতে নেই, আলোচনায় নেই।

তাই নতুন প্রজন্ম বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত। অতীতের মহামূল্যবান সম্পদ ভুলে বসে আছে। বরং যারা স্বাধীনতা চায়নি, চরম বিরোধিতা করেছে তারা মূল্যায়িত হয়েছে। কিন্তু যারা স্বাধীনতা এনেছে তারা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত। এই কদিন আগে মন্ত্রিত্ব গেছে জনাব রাশেদ খান মেনন; মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলেন। কদিন পরই ফিরে এসেছিলেন। তখন বাংলাদেশে থাকা এবং শহরে ঘোরাফেরা সে এক অভাবিত ব্যাপার।
পাকিস্তানকে সমর্থন না করে থাকার পথ ছিল না। কী বলা যাবে, স্বাধীনতার পরপরই সব পাকিস্তানি কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়ে গেল বাঙালি, হয়ে গেল স্বাধীনতার পক্ষের। আর যারা দীর্ঘ নয় মাস অনিশ্চিত জীবন বয়ে বেড়াল তারা হয়ে গেল অবহেলিত অনাদৃত। এটা এখন নয়, স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনে কোনো দুর্বলতা যদি থেকে থাকে তা হলো যারা পাকিস্তানে আটকা ছিল তাদের দেশে আনার জন্য রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেননি। অনেক কিছুই ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানে আটকা পড়া বাঙালিদের ফিরিয়ে এনেছিলেন।

পাকিস্তানে আটকে থাকা সবাই বাঙালি ছিল না। তারা অনেকেই মনেপ্রাণে পাকিস্তানিও ছিল। জনাব হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পাকিস্তানে আটকা ছিলেন না। আটকা থাকলে কী করে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দুবার পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে তার রংপুরের বাড়িতে যান। এসব কোনো কথাই বলতে চাই না। কিন্তু কেন যেন মনের অজান্তেই হামাগুড়ি দিয়ে সব বেরিয়ে আসে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আজও সবার কাছে এক হলেন না। সবাই মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারল না। সন্তান যদি পিতাকে স্বীকার না করে বা স্বীকার করতে না চায় তাহলে তার পরিচয় কোথায়?
আর পিতৃপরিচয়হীন মানব-সন্তানের গর্ব করার কী থাকে। কিন্তু আমরা বুঝতে চাই না। একসময় ‘জয় বাংলা’ ছিল বাংলার আকাশে-বাতাসে-সাগরে-নদীতে। কিন্তু আজ ‘জয় বাংলা’র করুণ দশা দেখে মাঝেমধ্যে ভাবি, স্বাধীনতার রণধ্বনি তার এমন নিদারুণ বিপর্যয়! মুক্তিযুদ্ধের অনেক সময় একে অন্যের সঙ্গে দেখা হলে হিন্দুদের আদাব, মুসলমানের সালামের পরিবর্তে ‘জয় বাংলা’ বলা হতো।

এটা কেউ বলে কয়ে দিত না, এ ছিল এক স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি। কিন্তু আজ তা হয়ে গেছে এক দলীয় স্লোগান। জাতীয় ভাবধারার ছিটেফোঁটাও নেই। এটা আমাদের পতন না উত্থান- সময় থাকতে বিচার করা দরকার। যে যাই বলুন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ প্রধান কারণ ’৭০-এর গণরায় পাকিস্তানিদের মেনে না নেওয়া। ’৭০-এর ভোটের রায় যদি তারা মেনে নিত কলাকৌশল করে আরও কিছু বছর পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে পারত। যে গণতন্ত্রের জন্য আমাদের দেশের জন্ম যে গণতন্ত্রকে আমরা পৃথিবীর দরবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলাম সেই গণতন্ত্রের আজ কি করুণ দশা!

উপজেলা নির্বাচন শেষ পর্যায়ে। মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। সেদিন আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘ভোটারের অংশগ্রহণ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই।’ কারও মাথা থাকলে তো ব্যথা থাকবে। তার মাথা-মনন কিছুই নেই। মানুষ এমন লাজলেহাজহীন হয়! দেশের যে কত বড় ক্ষতি হচ্ছে কেউ ভেবে দেখছে না। দেশের মানুষ হতাশ হলে নাগরিকরা হতাশ হয়ে পড়লে তাদের উৎসাহী করা বড় কঠিন কাজ। জাতীয় সমস্যা জাতীয়ভাবে সবাই মিলেমিশে মোকাবিলা বা সমাধান করা উচিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো বেঁচে আছি বলে সবার কাছে সেই দাবিই করি, দেশ কারও একার নয়। দেশ সবার।

সাধারণ মানুষ বড় কষ্ট স্বীকার করে, মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। আজ যারা যত বড় তারা তাদের কাছে তত বেশি ঋণী। কথাটা ভুলে গেলে বড়রাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বেশি। তাই এই মহান দিনে সব দেশবাসীকে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিবাদন-অভিনন্দন জানাই। বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারসহ মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের আত্মার শান্তি কামনা করি। লেখক : কাদের সিদ্দিকী, রাজনীতিক। উৎসঃ বিডি প্রতিদিন
শেয়ার করুন-

Loading...