৪ কোটি টাকা আত্মসাত, এসকে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন

17

ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) ঋণ জালিয়াতি ও ৪ কোটি টাকা আত্মসাতে জড়িত থাকার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এসকে সিনহা)সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠনের অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি। একইসঙ্গে অপর এক মামলায় এসকে সিনহাকে অব্যাহতি দিয়ে মামলার বাদী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। বুধবার (৪ ডিসেম্বর) দুদকের বিশেষ অনুতদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান এ তথ্য জানান।দুদকের করা মামলায় এসকে সিনহা ছাড়াও অন্য ১০ জন হলেন- ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীম, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক ক্রেডিট প্রধান গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মো. জিয়া উদ্দিন আহমেদ, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের স্থায়ী বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান, একই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, সান্ত্রী রায় ওরফে সিমি ও তার স্বামী রনজিৎ চন্দ্র সাহা।

এর আগে গেল ১০ জুলাই দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে কমিশনের জেলা সমন্বিত কার্যালয় ঢাকা-১ এ উল্লিখিত ১১ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।মামলায় ঘটনাস্থল দেখানো হয়, ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) শুলশান শাখা ও প্রধান কার্যালয়। ঘটনার সময় দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর। মামলাটি দায়ের করা হয় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ (২), (৩) ধারায়।এর আগে ফারমার্স ব্যাংক থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার অ্যাকাউন্টে ৪ কোটি টাকা জমা হওয়ার বিষয়টি তদন্ত শুরু করে দুদক। ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি এ কে এম শামীমসহ ৬ কর্মকর্তাকে তলব করেছিল কমিশন।এর পর গেল গেল বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর এসকে সিনহার ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তরের বিষয়টি জানতে ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এম শামীমসহ ৬ ব্যাংক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

এর আগে ২০১৮ সালের ৬ মে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে দুই ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহাকে এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।এসময় তাদের আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, এস কে সিনহাকে তাঁর বাড়ি বিক্রির ৪ কোটি টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।আইনজীবীরা বলেন, এস কে সিনহার উত্তরার ৬তলা বাড়িটি ৫ কাঠা জমির ওপর ছিল। এ বাড়িটি ২০১৬ সালের শুরুর দিকে টাঙ্গাইলের বাসিন্দা শান্ত্রি রায় ৬ কোটি টাকায় ক্রয় করেন। বায়না দলিলের সময় তিনি ২ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। বাকি টাকা পরিশোধের জন্য নিরঞ্জন ও শাহজাহানের সহযোগিতা নেন। নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা রনজিতের চাচা (চাচা শ্বশুর)। আর শাহজাহান রনজিতের বন্ধু।তারা বলেন, বাড়ি কিনতে বাকি ৪ কোটি টাকা ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে নিরঞ্জন ও শাহজাহান ২ কোটি টাকা করে মোট ৪ কোটি টাকা ঋণ নেন। ঋণ পরিশোধে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে শান্ত্রি রায় জামিনদার হন। জামিনদার হিসেবে টাঙ্গাইল ও ঢাকার আশপাশের বেশকিছু জমি বন্ধক রাখেন শান্ত্রী।

তাদের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের মে মাসে জমির বায়না দলিল হয় এবং ওই বছরের ৮ নভেম্বর দুটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে এস কে সিনহা সোনালি ব্যাংক সুপ্রিম কোর্ট শাখার মাধ্যমে চার কোটি টাকা গ্রহণ করেন। পে-অর্ডারের পরে ২৪ নভেম্বর হস্তান্তর দলিলের মাধ্যমে বাড়িটি শান্ত্রি রায়কে বুঝিয়ে দেন।ফারমার্স ব্যাংক থেকে ঋণের নামে আত্মসাৎ ও পে-অর্ডারে এক ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি টাকা জমা দেয়ার অভিযোগে ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহাকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন জিজ্ঞাসাবাদ করেন।দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এসকে সিনহার বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট অ্যালায়েন্সের (বিএনএ) চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার এবং দলটির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা।সেই মামলায় হুদা অভিযোগ আনেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তার (নাজমুল হুদা) বিরুদ্ধে হওয়া একটি মামলা উচ্চ আদালতে ডিসমিস করার পরও প্ররোচিত হয়ে মামলাটির রায় পরিবর্তন করা হয়। মামলাটি ডিসমিস করতে ২ কোটি টাকা ও অন্য একটি ব্যাংক গ্যারান্টির আড়াই কোটি টাকার অর্ধেক ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন এসকে সিনহা।

এর এক সপ্তাহ পরই ৪ অক্টোবর দুদকের সেগুনবাগিচা কার্যালয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংকের দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার অ্যাকাউন্টে ৪ কোটি টাকা লেনদেনের ঘটনায় অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।’তবে সেই মামলা থেকে এসকে সিনহাকে অব্যাহতি দিয়ে এখন মামলার বাদী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার বিরুদ্ধেই মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। পরে বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন বলে ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের অক্টোবরে দুদকের অনুসন্ধানে ফারমার্স ব্যাংকের দু’টি অ্যাকাউন্ট থেকে ৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে জালিয়াতির প্রমাণ মেলে। মামলার আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন ওই ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণের সেই টাকা পরে বিচারপতি সিনহার ব্যাংক হিসাবে যায়। টাকার উৎস হিসেবে বাড়ি বিক্রির কথা উল্লেখ করা হয়।

Loading...