ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার নামে চলছে রমরমা ব্যবসা

185

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শ্যামলী এলাকায় ঢাকা শিশু হাসপাতাল অবস্থিত।নানা রকম ভোগান্তি থাকার পরো স্বল্প খরচে সুচিকিৎসায় হাসপাতালটির সুনাম ছিল।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জটিল রোগ নিয়ে এই হাসপাতালে আসেন।অনেক অভিযোগ আগে থেকেই ছিল।

সম্প্রতি হাসপাতালটি অতি মাত্রায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।যেকারনে গরীব রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেয়া অসম্ভবপর হয়ে উঠেছে।হাস্পাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া বিভিন্ন রোগীর সাথে আলাপ করে দেখা গেছে, ৩-৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার পর তাদের ১০-১৫ হাজার টাকা গুনে ছাড়পত্র নিতে হয়েছে।বেড ভাড়া ৭০০ টাকার সঙ্গে বিভিন্ন টেস্ট এবং নার্সিং সার্ভিস বাবদ বিল করা হয়েছে বেড ভারার কয়েকগুন টাকা।গরীব অসহায় মানুষ বুঝতেন পারেন না এই কয়েক দিনের জন্য তাকে এত গুলি টাকা দিয়ে এখান থেকে বের করতে হবে শিশুকে।অধিকংশ মানুষ এই হাঁসপাতালটিকে সরকারি হিসেবেই জানেন।যদি হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সায়ত্ব শাসিত এই ব্যাপারে অধিকাংশের জানেন না।হাসপাতালের কোথাও এটি লেখা নেই।বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরাট বিরাট ফেস্টুন টাগানো রয়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন প্রান্তে।এতে সাধারণ মানুষের ধারণা জন্মায় এটি একটি সরকারি হাসপাতাল যেখানে বিনা মুল্য চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।ছাড়পত্রের সময় রোগীর স্বজনকে বিরাট অংকের একটি বিল হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে।সরকারি হাসপাতালে এত টাকা খরচ হবে তা সাধারণ রোগীদের চিন্তার বাইরে।ফলে অনেকে টাকার অভাবে ছাড়পত্র নিতে পারছেন না।

যেখানে অন্য সব সরকারি হাসপাতালে টিকিট কাটতে ১০ টাকার কম লাগে , এই হাসপাতলে এখন জরুরি বিভাগে টিকিট কাটতেই গুনতে হয় ১২০ টাকা।৫ মিনিটের গ্যাস এবং অক্সিজেন দেওয়ার বিল যথাক্রমে ২০০ এবং ৩০০ টাকা।যতবার রোগীকে ৫ মিনিটের জন্য গ্যাস (লেবুলাইযেশন) দেওয়া হবে ততবার ২০০ টাকা গুনতে হবে!যে গ্যাস দেওয়া হবে সেটিও রোগীদের টাকায় কেনা।হাসপালের মেশিনে শুধু সেটি পুষ করা হয়।এভাবে শুধু গ্যাসের বিল ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে,অধিকাংশ রোগীর বিলিং দেখে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে।এছাড়াও বিভিন্ন টেস্টের মুল্য ইবনে সিনা কিংবা পপুলারের মত প্রাইভেট হাসপাতাল থেকেও বেশি।এক্সরে করাতে যেখানে প্রাইভেট হাসপাতাল্গুলিতে ৩০০ টাকার বেশি নেয়া হয় না সেখানে এই বিশেষায়িত গরীবদের হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা।

দুপুরের পর হাসপাতালে আর ডাক্তারদের দেখা মেলেনা।যেখানে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলিতে ডাক্তাররা অন্তত দুইবার রাউন্ড দেন, বাড়তি টাকা এবং বেড ভাড়া নেওয়ার পরো এই হাসপাতালে সারাদিনে ডাক্তার একবার রাউন্ড দেন।এ যেন আরেকটি বালিশপুর!

এছাড়াও হাসপাতালটিতে সাম্প্রতিক নানা সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা শিশু হাসপাতালের কর্মকাণ্ড প্রথমে পরিচালিত হতো ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক থেকে। পরে ১৯৭৬ সালে বর্তমানে যেখানে অাছে ( শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডের পূর্বে) সেখানে কার্যক্রম শুরু করে ঢাকা শিশু হাসপাতাল।
বিশ্বমানের হাসপাতালটি সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। একদিকে যেমন এখানে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো তাগিদ নেই, অন্যদিকে রয়েছে রোগীর সঙ্গে দর্শনার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব। বাড়তি ফি অাদায়ের অভিযোগ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
হাসপাতালে রোগীর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচণায় রেখে সব সময় পরিষ্কার রাখার নিয়ম থাকলেও ঢাকা শিশু হাসপাতালে তার বালাই নেই। হাসপাতালের প্রবেশপথে দাঁড়ালেই দেখবেন চার দিকে ছড়িয়ে অাছে নানা ধরনের ময়লা আবর্জনা। হাসপাতালের পাশের ড্রেনে পচা ময়লা আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ায় নাকে রুমাল চেপে হাসপাতালে প্রবেশ করতে হয়। এর ভেতরেও নোংরা পরিবেশ বিরাজ করছে।

এ হাসপাতালটির টয়লেট ও ওয়াশরুম দেখে মনে হয়েছে সর্বশেষ কবে পরিষ্কার করা হয়েছে তা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও সঠিকভাবে বলতে পারবেন না। প্রায় প্রতিটি বাথরুম ব্যবহারের অনুপযোগী। তবুও অন্য কোনো উপায় না থাকায় রোগী ও তাদের স্বজন বাধ্য হয়ে সেগুলো ব্যবহার করছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে অালাপকালে রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, এমন পরিবেশে যে কোনো সুস্থ শিশুও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অথচ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা রোগীর স্বজনদের দাবি, ভালো চিকিৎসার অাশায় স্থানীয় ডাক্তাররা তাদের এখানে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।

পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে চার বছর বয়সী শিশুকে নিয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে এসেছেন জোবেদা ইয়াসমিন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে অালাপকালে তিনি বলেন, হাসপাতালের বাথরুমের অবস্থা এতো খারাপ গত তিনদিন তিনি হাসপাতালের বাথরুম ব্যবহার করেননি । তিনি অারও বলেন, অাগে জানলে এখানে তিনি তার শিশুকে ভর্তি করাতেন না।

একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে অাসা ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, রোগীদের এসব সমস্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। তার দাবি হাসপাতালের পরিবেশের সমস্যা যেন অতিদ্রুত সমাধান করা হয়।

এদিকে, ৬৫০ শয্যার ঢাকা শিশু হাসপাতালে দূর থেকে আসা রোগীর স্বজনদের জন্য নেই পর্যাপ্ত থাকার ব্যবস্থা। গরিব রোগীরা অর্থ সংকটে সিট না পেয়ে নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের বাইরে পলিথিন বিছিয়ে রাত পার করে। গত কয়েক রাত ধরে সেভাবে রাত পার করছেন গফরগাঁওয়ের যুবক অামিন উল্লাহ। তিনি ও তার স্ত্রী সন্তানের চিকিৎসার অাশায় ঢাকা শিশু হাসপাতালে অাছেন গত কয়েকদিন ধরে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে বাড়তি ফি আদায়ের উদ্দেশ্যে রোগীর অপারেশন কার্যে বিলম্ব হচ্ছে, এমন অভিযোগ করেন কয়েকজন রোগীর স্বজন। সুস্থ রোগীকে নানা অজুহাতে হাসপাতালে দিনের পর দিন ভর্তি করিয়ে রাখার অভিযোগ করেছে একাধিক রোগীর স্বজন। রোগীর স্বজনরা এসব অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসলেও নির্বিকার প্রশাসন।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে অভাব দেখা দিয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির। হাসপাতালের নিজস্ব কোনো সিটি স্ক্যান মেশিন নেই। যদিও একটি এক্সরে মেশিন অাছে তবে তা পর্যাপ্ত নয়। যাবতীয় পরীক্ষা বাইরে করতে হয় বাইরে গিয়ে।

পর্যাপ্ত আসন সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, জনবল কাঠামোয় সমস্যা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী সংকট, পর্যাপ্ত নার্স সংকট, ইমার্জেন্সি ডাক্তারদের আবাসিক হোস্টেল সংকটসহ নানাবিধ কারণে ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসা সেবায় প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। এ কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল জেলা ও উপজেলা থেকে ছুটে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা একদিকে যেমন চরম বিড়ম্বনায় পড়ছেন অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত হাসপাতালটির সুনাম নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. অাবদুল অাজিজ একুশে টেলিভিশন অনলাইকে বলেন, এটি শিশুদের জন্য দেশের বৃহৎ একটি হাসপাতাল। সারা দেশ থেকে যে পরিমাণ রোগী আসে সে তুলনায় আসন সংকট রয়েছে। ২০০ থেকে বর্তমানে ৬৫০ বেডের হাসাপাতালে উন্নতি হয়েছে এটি। কিন্তু শয্যা আরও বাড়ানো দরকার।

হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমরাও লক্ষ্য করেছি। কিন্তু আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মী সংকট থাকায় এ সমস্যা হচ্ছে। হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট থাকায় রোগীদের সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া হোস্টেল সমস্যা, নার্স ও ডাক্তার সংকট নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ চলছে। অাশা করছি খুব শিগগিরই অামরা এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবো।

অধ্যাপক ডা. মো. অাবদুল অাজিজ অারও বলেন, তবে আমি সবর্দা চেষ্টা করেছি হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে। কতটুকু পেরেছি বর্তমানে হাসপাতালের পরিস্থিতিই তার প্রমাণ।

উল্লেখ্য, ঢাকা শিশু হাসপাতালে দাপ্তরিক বর্তমানে ৬৫০ আসনবিশিষ্ট এ হাসপাতালটিতে ২৫ জন অধ্যাপক, ১৭ জন সহযোগী অধ্যাপক, দুজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট এবং ৩০ জন সহকারী অধ্যাপক, ২৯৬ জন নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৮৩৭ জন কর্মরত অাছেন।

Loading...