‘বিনা জামিনে, বিনা বিচারে পুলিশ দিয়ে জেলে পাঠানোর রাজনীতি তো নির্যাতন’

293

স্টাফ রিপোর্টার: শাসনতন্ত্রে বলা আছে, একজন আসামি আইনজীবীর সাহায্য নিতে পারবে। কিন্তু একবার জেলে ঢোকাতে পারলে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগই দেয়া হয় না। কোনো আইনজীবী যোগাযোগ করলে তবেই সে তার সাহায্য নিতে পারে। শাসনতান্ত্রিক অধিকারগুলো সম্পর্কে পুলিশ ও জেল কর্তৃপক্ষকে অধিকতর সচেতন করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু করবে কারা? রাজনৈতিক নেতৃত্ব তো নেই।

বেশ কয়েকজন আমাকে বলেছে, জেল থেকে বের হওয়ার পর আমি যেন তাদের আইনগত সাহায্য করি। কতটুকু তাদের জন্য করতে পারব জানি না। জেলে পুরলেই সমস্যার সমাধান হয় না। যারা অন্যায়কারী তাদের শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু বিনা জামিনে, বিনা বিচারে পুলিশ দিয়ে জেলে পাঠানোর রাজনীতি তো নির্যাতন। পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার। এ
কটি সুন্দর দেশ গড়তে উদার মনের নেতৃত্ব ও সুন্দর মনের মানুষের প্রয়োজন। আমি আশান্বিত হলাম এটা দেখে যে, তরুণদের মধ্যে এখনও সুন্দর মন মরে যায়নি। জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও যথেষ্ট সম্মান ও সহযোগিতা পেয়েছি। নিজের দেশে এটাই তো আশা করি। যারা মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য তাদের অবশ্যই মর্যাদা দিতে হবে।

আমার এ লেখাটির মূল লক্ষ্য একটি সাধারণ মানহানির মামলা নিয়ে আমার প্রতি যে নোংরা আচরণ করা হয়েছে সেটা নয়। দেশব্যাপী রাজনীতিতে পুলিশি মামলার যে ছড়াছড়ি, তার বিপজ্জনক দিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।জনগণের ওপর মামলা-হামলার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা পুলিশের দায়িত্ব নয়। ফরমায়েশি পুলিশি মামলার ভয়ে সারা দেশের মানুষ ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছে। পুলিশ তো হবে জনগণের বন্ধু। রাজনীতি করবেন রাজনীতিবিদরা।
পুলিশে এখন অনেক ভদ্র, শিক্ষিত লোক যোগ দিয়েছে। তাদের দিয়ে রাজনীতি করাতে গিয়ে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি যোগ্য, সৎ পুলিশ বাহিনী যে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য সে প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে না।কমপক্ষে জেলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বন্দি রাজনৈতিক মামলার শিকার। একেকজনের বিরুদ্ধে ২৫-৩০টি করে মামলা দেয়া হয়েছে। মামলার সত্যতা কোনো বিষয় নয়, জামিনে মুক্তি পাওয়াকে অসম্ভব করতে পারলেই হল।

গুরুতর মামলা হলে তো একটিই যথেষ্ট। এসব বিষয় নিয়ে ভাববার লোক দুর্লভ। কারাগারগুলোতে ঠাঁই নেই। অথচ বেশিরভাগ বন্দিকে ছেড়ে দেয়ার, জামিন দেয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের প্রতি চরম অন্যায় করা হচ্ছে।অবশেষে হাইকোর্টের নির্দেশে আমাকে ডিভিশন দেয়া হল। আইনজীবী হিসেবে ড. কামাল হোসেনের ল’চেম্বারে আমি তার জুনিয়র ছিলাম। তিনি কোর্টে আমার পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ’মানিক মিয়ার ছেলেকে জেলে ডিভিশন পেতে হাইকোর্টে আসতে হয়!’
মানিক মিয়ার ছেলে ছাড়া আমার নিজেরও তো কিছু অর্জন আছে। আমি বঙ্গবন্ধুর সময় সংসদ সদস্য ছিলাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ছিলাম। নিজে একজন সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী।সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলাম। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছি। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রেস কমিশনের রিপোর্ট তৈরিতে আমি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলাম।

স্বাধীন দেশে মানুষের সাহস জোগায় বিচারব্যবস্থা। এজন্য জনগণ শাসনতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে বিচার বিভাগের ওপর। এর অর্থ জনগণের অধিকার ও শাসনতন্ত্রসম্মত শাসনের ব্যাপারে জনগণ রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা না রেখে আস্থা রেখেছে বিচার বিভাগের ওপর।বিচার প্রক্রিয়ায় ভয়ভীতির স্থান থাকতে পারে না। মানুষের অধিকার নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতা অর্থহীন। বর্তমানে মানুষ তাই বড় অসহায়। জামিনের আবেদনের ভিড়ে সুপ্রিমকোর্টে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সুপ্রিমকোর্ট এখন জামিনের আবেদন নিয়ে মহাব্যস্ত। সুপ্রিমকোর্টের অস্তিত্ব ও সাহস না থাকলে দেশের বিচারব্যবস্থা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ত।
আমরা নিশ্চয়ই একটি সুস্থ, সভ্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চালানোর যোগ্যতা রাখি। সেই শিক্ষাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বিশেষ গুরুত্ব সহকারে আমাদের শিখিয়ে গেছেন।গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বাঙালিদের উজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বেই তদানীন্তন পাকিস্তানে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মানিক মিয়াসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই তখন জাতি গঠনে নীতি-আদর্শ ও সততার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিতেন।ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের মুখেই শুনতে হয়েছে, তারা কল্পনাও করতে পারেননি যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এত নির্লজ্জভাবে ভোট ডাকাতি হবে। তারা ছোটাছুটি করতে থাকলেন সাক্ষীগোপাল নির্বাচন কমিশন অফিসে।

এমনকি তারা জনগণের সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ রক্ষা করেননি। ভেবেছিলেন জনগণ তো সরকারের বিপক্ষে, তাই জনগণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীকেই ভোট দেবে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিএনপির মতো একটি বড় দল রাজনৈতিক দল হতে পারছে না। শুধু নির্বাচনের আশায় ব্যস্ত থাকার কারণে। এখন তো নির্বাচনও গেল।দীর্ঘদিনের সংগ্রাম শেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ অবস্থায় বৈরুত থেকে আব্বার কাছে লেখা এক পত্রে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলেন, আমরা যারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য লড়াই করছি তারা ব্যর্থ থেকে গেলাম।
পরবর্তী সময়ে যে রাজনীতি দেখা দেবে তা হবে ভয়াবহ নৈরাজ্যিক চরিত্রের। শহীদ সাহেব এ বক্তব্য যখন রাখেন তখন দেশে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। পরবর্তী সময়ে কী ধরনের ভয়াবহ হিংসা-বিদ্বেষ দেশে চলেছে তা তো সবাই দেখেছি।মনে হচ্ছে ১৮ কোটি লোকের এ দেশে এত শিক্ষিত, যোগ্য ও সৎ লোক থাকা সত্ত্বেও আমরা দেখাতে পারছি না যে, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আমাদের কোনো গঠনমূলক ভূমিকা আছে বা আমরা জাতির কোনো উপকারে আসছি।

আপস ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করতে সচেষ্ট ছিলাম। কোনো সমঝোতা নয়, আমলা সাহেবদের ভোট ডাকাতির ষড়যন্ত্রই সহজ পথ মনে করা হল। এ হতাশা ও ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই আমাদের মতো কিছু লোককে হয়তো বাকি দিনগুলো কাটাতে হবে। বোবা হয়ে থাকাই শ্রেয় মনে হচ্ছে।নির্বাচনে কারচুপি এত বিশালভাবে হয়েছে যে, সংশ্লিষ্টরাই তার প্রমাণ রেখে গেছে। আমলাদের বুদ্ধিতে এটা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু তারা সমাধান দিতে পারবে না। ভোট কারচুপি হয়েছে জাতির বিরুদ্ধে।
তাই সংকটের সমাধানও হতে হবে জাতীয়ভাবে, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায়। ভোটাধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা সর্বজনীন মানবাধিকার লঙ্ঘন। কোনো স্বাধীন জাতি ভোটাধিকারহীন হয়ে থাকতে পারে না। আমরাও থাকব না। পুলিশি মামলা-হামলার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। জনগণের ভোটের শাসনতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এটাই নিরাপদ, সহনশীল রাজনীতির পথ। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
শেয়ার করুন-

Loading...