ধ’র্ষণের শিকার এক কলেজছাত্রীকে যৌনকর্মী আখ্যা দিয়ে বেকায়দায় চেয়ারম্যান

425

ধ’র্ষণের শিকার এক কলেজছাত্রীকে ‘যৌনকর্মী’ আখ্যা দিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন টাঙ্গাইলের এক ইউপি চেয়ারম্যান।টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান মতি সম্প্রতি তার এলাকার এক কলেজ ছাত্রীকে ‘যৌনকর্মী’ এবং তার বাবাকে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে বাড়ি ছাড়া করার চেষ্টা চালান।ওই কলেজছাত্রীর বাবা বলেন, “চেয়ারম্যান আমার পরিবারকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন।

“চেয়ারম্যান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে গ্রাম থেকে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা পরিবার পরিজন নিয়ে এখন নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছি। ”
তার অভিযোগ, ধ[র্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে তার মেয়েকে ‘দেহ ব্যবসায়ী’ এবং তাকে ‘মা[দক ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে বাড়ি ছাড়া করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে এ নোটিস পাঠিয়েছেন।

এর আগে ‘প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা’ ওই কিশোরী ধ[র্ষণের শিকার হলে গত বছরের পহেলা নভেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন মেয়েটির বাবা।মামলার আসামিরা হলেন, ওই ইউনিয়নের সারুটিয়াগাজি গ্রামের জয়ধর শেখের ছেলে মো. জুয়েল রানা (২২), ধুবড়িয়া গ্রামের হায়েদ আলীর ছেলে মো. শিপন (২৬), মো. রিপন (২৩), উফাজ (৪২) ও একই গ্রামের মো. বাবুল মিয়ার ছেলে মো. রিয়াজ মিয়া (২১)।

এদিকে নাগরপুর থানার ওসি আলম চাঁদ বলেন, চেয়ারম্যান কলেজছাত্রীর বিরুদ্ধে যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা সঠিক নয়। এ পরিবারের নামে মাদক ও দেহ ব্যবসার বিষয়ে এলাকায় ও থানায় কোন অভিযোগ নেই।ধ[র্ষণ মামলার আসামিরা ওই পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মেয়েটির পরিবারের নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।”

এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার ধুবড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মতিউর রহমান মতির সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “আমি চেয়ারম্যান আমি দিতে পারি তাই দিয়েছি।“ছাত্রীর বিরুদ্ধে মাদক ও দেহ ব্যবসার ক্ষেত্রে কোন মামলা আছে কি না আমি জানি না। এলাকার লোকজন বলেছে তাই আমি এ প্রতিবেদন দিয়েছি।”

তবে টাঙ্গাইল জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এস আকবর খান বলেন, আদালত কর্তৃক কাউকে দোষী না করা পর্যন্ত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা তো দূরের কথা মা’দক ও দেহ ব্যবসায়ী বলে কাউকে আক্রান্ত করার এখতিয়ার কারও নেই।

চেয়ারম্যানের দেওয়া ওই নোটিসকে ‘সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের শাস্তি হওয়া উচিত।”
মেয়েটির কৃষিজীবী করা বাবা জানান, তার কলেজপড়ুয়া মেয়েকে প্রায়ই উত্যক্ত করত সারুটিয়াগাজি গ্রামের জয়ধর শেখের ছেলে জুয়েল রানা। জুয়েলের দেওয়া বিয়ের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যানও করেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে জুয়েল রানা ২০১৮ সালের ১২ জুলাই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধুবরিয়া বাচ্চু মিয়ার সেতুর সামনে থেকে বন্ধুদের সহযোগিতায় তার মেয়েকে জোর পূর্বক তুলে নিয়ে ধ’র্ষণ করে এবং তার আত্মীয় বাড়িতে তিনদিন আটকেও রাখে বলে জানান তিনি।

ওই বাড়ি থেকে কৌশলে পালিয়ে এসে তাদের জানায়। এসময় গ্রামের প্রভাবশালীদের কাছে প্রতিকার চাইলে তারা তালবাহানা ও কালক্ষেপণ করতে থাকেন বলে দাবি করেন তিনি।পরে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা করেন তিনি।

এ মামলায় আদালতে দেওয়া সিআইডির চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে নাগরপুর থানার ওসি আলম চাঁদ জানান, এ মামলার কলেজ ছাত্রীর বাবা একজন হত দরিদ্র কৃষক। তিনি দিনমজুরের কাজ করেন এবং এক প্রবাসীর বাড়িতে স্ত্রী ও চার মেয়ে নিয়ে দূর্বিষহভাবে বসবাস করে আসছেন।‘উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওই ছাত্রীর সঙ্গে জুয়েল রানার পরিচয় হয়। জুয়েল ছাত্রীটিকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিলে সে তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে জুয়েল রানা এ ঘটনা ঘটায়।’

স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনাটির খোঁজ-খবর নেওয়া শুরুর পর গত বুধবার নাগরপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মত পাল্টে ভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরেন চেয়ারম্যান মতিউর।লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, কলেজছাত্রী ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা আমি জানতাম না। এমনকি আদালতে ধ’র্ষন মামলা আছে জানলেও ওই নোটিস আমি পাঠাতাম না।

ওই মেয়ের পরিবারকে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য নোটিস দিতে ধুবড়িয়া গ্রামের সাবেক দুই ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকাবাসী তার উপর চাপ সৃষ্টি করায় তিনি নোটিস দেন বলে দাবি করে বলেন, “নোটিশে ভাষাগত ভুলের জন্য আমি প্রশাসন ও সর্বসাধারনের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। ”এদিকে এ ঘটনার পর ওই কলেজ ছাত্রী লোকলজ্জার কারণে বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। অন্যদিকে গত ২৪ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া ধর্ষণ মামলার আসামিরা পলাতক রয়েছে বলের জানিয়েছে পুলিশ।

Loading...