গণতন্ত্রকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে : মির্জা ফখরুল

214

করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সবাইকে সচেতন থাকার তাগিদ দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমাদের দেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে করোনা ভাইরাস যেকোনও সময় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। শুক্রবার (১৩ মার্চ) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের দেশে গণতন্ত্রকে পরিকল্পিতভাবে হ’ত্যা করা হয়েছে। আমাদের দলের চেয়ারপারসন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর মত ত্যাগ কেউ করেনি। সেই গণতন্ত্রের নেত্রীকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না, যেন এ সরকার তাদের অপকর্ম চালিয়ে যেতে পারে। আপনারা দেখেছেন বিচার বিভাগে কিভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যেদিন সিনহা সাহেবকে বন্দুকের মুখে দেশত্যাগে বাধ্য করা হলো সেদিন জুডিশিয়ারি শেষ। আপনারা দেখেছেন তারেক রহমানের মামলায় যে জাজ তাকে খালাস দিয়েছেন তাকে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। আপনারা পিরোজপুরে দেখেছেন কিভাবে সরকারি দলের একজন নেতাকে জামিন না দেয়ার কারণে একজন জাজকে বদলি হতে হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে এবং ওই নেতাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেয়া হয়েছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ডিইউজের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন যখন হচ্ছে তখন সাংবাদিকতা সম্ভবত সবার চেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রের কাঠামো এবং সরকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। এছাড়া প্রযুক্তির কারণেও চ্যালেঞ্জ পেতে হচ্ছে। নিউজ পেপারে যারা কাজ করছেন তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। কারণ পরের দিন সকালে তাদের নিউজটি ছাপা হয়, কিন্তু তার আগেই মোবাইল বা অনলাইনে সেই খবরগুলো পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা পৃথিবীতে মুক্তচিন্তার যে বাতাস বইছিলো তা সরিয়ে দিয়ে একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ বেশ জানান দিয়ে সারা পৃথিবীতে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সাংবাদিকদের সবসময় শ্রদ্ধার চোখে দেখে। ভাষার জন্য আন্দোলনে, গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতার লড়াইয়ে সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অভূতপূর্ব। আজ অনেক সাংবাদিক বলছেন- আমাদের কি সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে হবে! তারা ভাবছেন যারা সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করছে তারা মনে হয় ভুল করেছে। কারণ এখানে জীবন ও আর্থিক নিরাপত্তা নেই। সর্বোপরি লেখা ছাপা হবার পর মামলা হবে নাকি গুম হয়ে যেতে হবে- তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই।’“যুগে যুগে যারা মুক্তি যুদ্ধ, স্বাধীনতার লড়াই, সংগ্রামের কথা বলে তাদের নিয়মিত নি’র্যাতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। কিছুদিন সুবাতাস বইলেও আবার সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে ও পরে অনেক বরেণ্য সাংবাদিকের লেখা আমরা দেখেছি। তারা অনেক সত্য কথা লিখেছেন মানুষ ও সত্যের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন গণহারে অনেককে দালাল বানানো হচ্ছিল, তখন সাংবাদিক এনায়েতুল্লাহ খান লিখেছিলেন- ‘ফোর অ্যান্ড হাফ ক্রোর কোলাবোরেটর’। এর অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল- যারা যুদ্ধের সময় ভারতে যাননি তাদেরকে কোলাবোরেটর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেসময় বিশেষ ক্ষমতা আইনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। বাকশাল গঠন করা হয়েছিল। মানুষের বাকস্বাধীনতা ছিল না। সেদিনও যারা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন তাদের নি’র্যাতন করা হয়েছিল, জেলে পোরা হয়েছিল। এখন সেই অবস্থা আবারও ফিরে এসেছে, কিন্তু একটু ভিন্ন চেহারায়। এখন তারা আইন তৈরি করে যাতে আপনারা (সাংবাদিকরা)আইনের বাইরে না যান এবং তারা যাতে আপনাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, ‘সংবাদপত্র এখন সাংবাদিকদের হাতে নেই, চলে গেছে করপোরেটদের হাতে, মালিকানা ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা তাদের জন্য কাজ করছে। সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করা হচ্ছে এখন। সাংবাদিকদের মাধ্যমেই আমরা জেনেছি কিভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে। আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারি কিভাবে ব্যাংক লুট হয়েছে, কিভাবে সম্পদ লুট করে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং কিভাবে সরকারি সম্পদ ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখন দেশে গণতন্ত্র নেই। একনায়কতন্ত্র ফ্যাসিবাদ দেশকে দখল করে আছে। আমরা যদি ভারতবর্ষের দিকে তাকাই, বলা হতো সেখানে গণতান্ত্রিক প্রাকটিস আছে। সেখানেও এখন দেখা যাচ্ছে সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, বিভিন্ন চ্যানেল বন্ধ করা হচ্ছে, কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না।’ ‘সারা পৃথিবীর দিকে তাকালে গত এক দশকে গোটা পৃথিবীতে কর্তৃত্ববাদী সরকার এসেছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আমরা হারিয়ে ফেলেছি।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে হবে। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, এই অনির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেয়ার জন্য। তাই সময় এসেছে উঠে দাঁড়াবার, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করবার, গণতন্ত্রকে রক্ষা করবার, এটিই আমাদের উপযুক্ত সময়।’ফখরুল বলেন, ‘জনগণের লড়াই সংগ্রামে সাংবাদিকরা সবসময় সামনের কাতারে ছিলেন। আমরা তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হই। এখানে বলা হয়েছে ৩৮ জন সাংবাদিক গুম হয়েছেন। চাকুরির নিশ্চয়তা নেই। সাগর-রুনি হ’ত্যাকাণ্ডের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে আছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিক ছাঁটাই হচ্ছে। সাংবাদিকরা কাজ করতে পারছে না। অথচ দেখছি দু-একজন সাংবাদিক নেতা বহু উপরে উঠে গেছেন। এটাই বাস্তবতা। সময় এসেছে নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো বিভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার- দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য।’

ডিইউজে একাংশের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরীর সভাপতিত্বে দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, বিএফইউজে একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, সাবেক মহাসচিব এমএ আজিজ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। কেএ/ডিএ